অনুগল্প

অনুগল্প জন্মান্তরের পাপ

জন্মান্তরের পাপ

লেখক : অ লো ক কু মা র দ ত্ত

বি.টি রোড। পাশেই মুখার্জ্জী ভিলা। সুখ্যাত পরিবার। এই মুখার্জ্জী পরিবার বিয়ে হয়েছিল মনোরমা দেবীর। তাঁর দুটি ছেলে। নাবালক অবস্থায় বাবা মারা যান। ছেলেদের শিক্ষা-দীক্ষার দায়িত্ব মায়ের ওপর পড়ে। তার অভিভাবকত্বে ছেলে দুটি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয় এবং পরবর্তীকালে তারা সরকারি উচ্চপদে বসেছিল; মায়েরওপর তাদের ভক্তি, শ্রদ্ধা ছিল প্রগাঢ়।
দীর্ঘদিন মা কঠিন অসুখে ভুগছেন। ছেলেরা মায়ের সুচিকিৎসার কোনোও কসুর করেননি। অথচ দিনের পর দিন মা ভীষণ দুর্বল হতে থাকেন। একদিন মা তিতিবিরক্ত হয়ে ছেলেদের বললেন---বাবা আর চিকিৎসার কোনোও দরকার নেই; বরঞ্চ আমাকে তোমরা তীর্থ দর্শনে পাঠিয়ে দাও। মাতৃভক্ত পুত্রেরা মাকে যথারীতি তীর্থে পাঠিয়ে দেওয়ার পাকা ব্যবস্থা করেছিলেন। মনোরমা দেবী তীর্থ পরিক্রমা করতে করতে উপস্থিত হয়েছিলেন হরিদ্বারে। সেখানকার মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যে অভিভূত হয়ে দীর্ঘদিন রয়ে গেলেন হরিদ্বারে। অকস্মাৎ এক সাধুর সঙ্গে তাঁর দেখা। মনোরমা গড় হয়ে প্রণাম করলেন সাধুুজিকে। পায়ের কাছে দশ টাকা প্রণামি রাখলেন।
---‘বোল্ মাইজি, তোর কী কষ্ট?’
---বাবাজি, তুমি তো জানো রোগে বড়ো কষ্ট পাচ্ছি এই কত বছর ধরে---এ রোগ কি সারবে না?---কাতর স্বরে বললেন মনোরমা।
সাধুুজি তার শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন---‘মাইজি ইয়ে রোগ ঠিক নেহি হোগা, লেকিন ইসকি দাওয়াই নেহি মিলেগা।’
মহিলা জিজ্ঞেস করলেন---সাধুজি মেরা অপরাধ ক্যা হ্যায়?’ সাধুজি বললেন---জনম্মে তুমনে পিতাজিকে লাথ মারাথা। হ্যাঁ, এক উপায় হ্যায়; মুর্শিদাবাদ জিলামে এক শহর হ্যায়; উস্কো নাম বহরমপুর। তুম জরুর বহরমপুর যানা অব উহাঁ তুমহারে পিতাজি গেট ম্যানকী নৌকরী করতা হ্যায়, উনসে মাফি মাঙ্গনেসে তুমহারি দাবা মিলেগি।’
ভoমহিলা পরের দিন হরিদ্বার থেকে দেশে যাত্রা করেন। তারপর বহরমপুর স্টেশনে পৌঁছান। তিনি উদ্ভ্রান্তেùর মতো ছুটতে ছুটতে এসে গেট ম্যানের পায়ে ধরেকাঁদতে থাকেন এবং একনাগাড়ে বলতে থাকেন, ‘‘আমায় ক্ষমা করো বাবা।’’ গেটম্যান বিস্মিত চোখে বলতে থাকেন---‘‘একি করছ মা, আমি মহাপাতক হতে চলেছি।’’
---‘‘না না, তুমি আমার পূর্বজন্মে বাবা ছিলে।’’
---‘‘ওরে পাগলি মেয়ে, কে বললো তোমাকে?’’---বিস্মিত গেটম্যান জিজ্ঞেস করেন।
‘‘হরিদ্বারে এক সাধু বলেছেন বাবা। তিনিই তো ঠিকানা বলে দিয়েছেন।’’
চোখে মুখে নিদারুণ বিস্ময় নিয়ে গেটম্যান মনোরমার দিকে তাকিয়ে থাকেন। জিজ্ঞেস করেন---‘‘সাধুজি কী বলেছেন?’’
---‘‘আমি পূর্বজন্মে বাবাকে লাথি মেরেছিলাম। সেই পাপে আমি কঠিন ব্যাধিতে ভুগছি। তুমি আমার পূর্বজন্মের বাবা। তুমি ক্ষমা না করলে আমার এ কঠিন ব্যাধি সারবে না।’’ বলে হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে থাকেন মনোরমা তাঁর পূর্বজন্মের পিতার পা-দুটো ধরে। ---‘‘বাবা, তুমি আমাকে ক্ষমা করেছ? মেয়ে হয়ে বাবাকে লাথি মেরেছিলাম, আজ সেই পাপে এ জন্মে আমার এই কঠিন ব্যাধি। বাবা, আমায় ক্ষমা করো।’’ ---পা দুটো জড়িয়ে ধরেন। বিস্মিত গেটম্যানের দুচোখ জলে চিক্চিক্ করে। ‘‘মা, আমি তোমায় ক্ষমা করেছি।’’ ---মাথায় হাত রেখে মনোরমাকে আশীর্বাদ করে গেটম্যান। অকস্মাৎ আন¨াশ্রুতে বুক ভাসিয়ে মনোরমা চিৎকার করে ওঠেন---‘‘দেখো বাবা, দেখো বাবা, আমার গায়ে পায়ে সর্বাঙ্গে যে কালসিটে দাগ ছিল, তা কেমন মিলিয়ে যাচ্ছে।’’ আন¨ বেদনায় তিনি চিৎকার করে ওঠেন---‘‘জয় সাধুবাবা, জয় সাধুবাবার জয়। দেখো বাবা, তুমি আমার জন্মান্তùরের বাবা। তোমার আশীর্বাদে আমার বুকের ব্যথাও ভালো হয়ে গেছে।’’
মনোরমা রেলের গেটম্যানের পায়ে মাথা রেখে কাঁদতে থাকেন।
গেটম্যান ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে। মনোরমাকে শান্তù করে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে রেলগেটের সুইচটা টিপে দেয়। ঢঙ্ ঢঙ্ ঢঙ্ রেলগেটের ঘণ্টা বাজতে থাকে। তারই মধ্যে ধীরে ধীরে নেমে আসে রেলের গেট। মুহূর্ত কয়েক বাদে ঝম্ ঝম্ আওয়াজ তুলে বেরিয়ে গেল একটি যাত্রীবাহী ট্রেন।

Copyright © 2022 Rupkatha Live. All Rights Reserved. Powered by : Technotrick Systems.